সপ্তম শ্রেণি দেবধর্ম জাতক গাইড ও নোট (পাঠ ৪)

Class 7 Guide & Notes
191

পুরাকালে বারানসি রাজ্যে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। সে সময় বোধিসত্ত্ব রাজকুমাররূপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম হলো মহিংসাস কুমার। তাঁর জন্মের দুই-তিন বছর পর এক ছোট ভাই জন্ম গ্রহণ করে। তাঁর নাম হলো চন্দ্রকুমার। চন্দ্রকুমার একটু বড় হলে রানি পরলোক গমন করেন। রাজা ব্রহ্মদত্ত তখন পুনর্বার বিবাহ করেন। কিছুদিন পর ছোট রানির এক ছেলে হলো। সেই ছেলের নাম হলো সূর্যকুমার। রাজা তখন খুব খুশি হয়ে রানিকে বর চাইতে বললেন। রানি তখন কোনো বর নিলেন না। তিনি বললেন, মহারাজ, এখন থাক, পরে আমি এই বর চেয়ে নেব।

সূর্যকুমার বড় হলো। রানি তখন রাজাকে বললেন, 'সূর্যকুমারের জন্মের সময় আপনি আমাকে একটি বর দিতে চেয়েছিলেন। এখন সেই বর আমাকে দিন। আমার ছেলেকে রাজা করে নিন। ব্রহ্মদত্ত বললেন, আমার বড় দুই ছেলে আগুনের মতো তেজস্বী। আমি তাদের রেখে ছোট কুমারকে রাজা করতে পারি না। রানি রাজার কথায় শান্ত হলেন না। তিনি দিনরাত রাজাকে এই নিয়ে বিরক্ত করতে লাগলেন। রাজাও এতে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি আশঙ্কা করলেন, রানির চক্রান্তে বড় দুই কুমারের ক্ষতি হতে পারে।

এই ভেবে রাজা বড় দুই কুমারকে ডেকে বললেন, ছেলেরা আমার, তোমাদের ছোট ভাইয়ের জন্যের সময় ছোট রানিকে আমি একটি বর চাইতে বলেছিলাম। বর স্বরূপ এখন তিনি সূর্যকুমারকে রাজা করতে চান। কিন্তু সে রাজা হোক আমি তা চাই না। আমি আশঙ্কা করছি এজন্য ছোট রানি তোমাদের ক্ষতি করতে পারে। তোমরা এখন বনে গিয়ে আশ্রয় নাও। আমার মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী বড় ছেলে রাজত্ব পাবে। তখন তোমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিও। এই বলে তিনি বড় দুই ছেলেকে বিদায় দিলেন।

দুই কুমার পিতার আদেশে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়ল। প্রাসাদের বাইরে তখন সূর্যকুমার খেলছিল। দুই ভাইয়ের মুখ থেকে বনে যাওয়ার কথা শুনে সেও ভাইদের সঙ্গে চলল। চলতে চলতে তিন ভাই হিমালয় পর্বতে পৌঁছল। সেখানে বোধিসত্ত্ব এক গাছের তলায় বসে সূর্যকুমারকে বললেন, ওই সরোবরে গিয়ে স্নান করে এসো। জল খেয়ে এসো। আসার সময় পদ্মপাতায় করে আমাদের জন্য জল নিয়ে এসো।

সেই সরোবরে এক জলরাক্ষস বাস করত। জলরাক্ষস সরোবরটি পেয়েছিল এক কুবেরের কাছ থেকে। সরোবরটি দেওয়ার সময় কুবের তাকে বলেছিলেন, দেবধর্ম জ্ঞানহীন কোনো লোক যদি এই সরোবরে নামে একমাত্র তাকেই তুমি খেতে পারবে। কিন্তু জলে না নামলে তাকে তুমি খেতে পারবে না। সূর্যকুমার এসব কিছুই জানত না। সে জলে নামতেই জলরাক্ষস তাকে ধরে বলল, দেবধর্ম কাকে বলে জান? সূর্যকুমার বলল, জানি, লোকে সূর্য ও চাঁদকে দেবতা বলে। রাক্ষস বলল, মিথ্যে কথা। তুমি দেবধর্ম কী জানো না-এই কথা বলে সে সূর্যকুমারকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে বেঁধে রাখল।

তিন রাজকুমার বনের দিকে যাচ্ছে

সূর্যকুমার ফিরে আসতে দেরি করছে দেখে বোধিসত্ত্ব চন্দ্রকুমারকে ছোট ভাইয়ের খোঁজে পাঠালেন। জলরাক্ষস চন্দ্রকুমারকেও প্রশ্ন করল, দেবধর্ম কী? চন্দ্রকুমার যে উত্তর দিল, জলরাক্ষস তাতে সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাই চন্দ্রকুমারকেও নিজের ঘরে নিয়ে বেঁধে রাখল।

চন্দ্রকুমার ফিরে আসছে না দেখে বোধিসত্ত্ব বুঝলেন দুই ভাই কোনো বিপদে পড়েছে। তাঁর সন্দেহ হলো নিশ্চয় ওই সরোবরে কোনো জলরাক্ষস আছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তীর, ধনুক ও তরবারি নিয়ে সরোবরের কূলে রাক্ষসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। রাক্ষস দেখল, বোধিসত্ত্ব জলে নামছেন না। তখন সে বনবাসী মানুষ সেজে বোধিসত্ত্বের সামনে এসে বলল, 'ভাই, আপনি ক্লান্ত। সামনে চমৎকার সরোবর। ওখানে নেমে স্নান করুন। জলপান করুন। তাতে আপনার ক্লান্তি কেটে যাবে।'

বোধিসত্ত্ব জলরাক্ষসকে চিনতে পারলেন। জলরাক্ষসও উপায় না দেখে বোধিসত্ত্বের কাছে সব কথা স্বীকার করল। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, দেবধর্ম কী তা আমি জানি। তুমি আমার কাছ থেকে তা কী জানতে চাও?

রাক্ষস বলল, হ্যাঁ চাই।

তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, 'এখন আমি খুব ক্লান্ত। আগে ক্লান্তি দূর করি। তারপর বলব।' তখন রাক্ষস তাঁকে স্নান করতে দিল। খাদ্য ও পানীয় দিল। বসার জন্য বিচিত্র আসন সাজিয়ে তাতে বসতে দিল। বোধিসত্ত্ব সেই আসনে বসলেন। রাক্ষস তাঁর পায়ের কাছে বসল। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, 'শান্ত, সত্যপরায়ণ ও নির্মল অন্তরে যিনি ধর্মকাজ করেন তিনি দেবধর্ম পরায়ণ। মনে পাপ জাগলে যিনি নিজে লজ্জা পান তিনি দেবধর্ম পরায়ণ।'

এই ব্যাখ্যা শুনে রাক্ষস সন্তুষ্ট হয়ে বলল, আপনি পণ্ডিত। আমি আপনার কথায় সন্তুষ্ট হলাম। আমি আপনাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আপনার একজন ভাইকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। বলুন, কাকে আনব? বোধিসত্ত্ব বললেন, আমার ছোট ভাইকে।

রাক্ষস বলল, আপনি দেবধর্ম জানেন। অথচ সেই অনুসারে কাজ করছেন না। মেজ ভাইয়ের বদলে ছোট ভাইকে চাইছেন কেন?

বোধিসত্ত্ব উত্তর দিলেন, আমি দেবধর্ম জানি এবং সেই অনুসারে কাজও করি। সবচেয়ে ছোট ভাইটি আমার সৎ ভাই। ওর জন্য আমরা বনবাসী হয়েছি। আমার বিমাতা ওকে রাজা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিতা তাতে রাজি হননি। আমাদের ছোট ভাইটিও সব শুনে আমাদের সঙ্গে বনবাসী হয়েছে। আমাদের ফেলে সে একদিনও রাজপুরীতে ফেরার কথা ভাবেনি। এখন ফিরে গিয়ে আমি যদি বলি তাকে রাক্ষস খেয়েছে তা কেউ বিশ্বাস করবে না। এজন্য আমি তাকে চাইছি।

রাক্ষস খুশি হয়ে দুই ভাইকে ফিরিয়ে দিল। তখন বোধিসত্ত্ব রাক্ষসকে বললেন, তুমি অতীত জন্মে পাপ করেছিলে বলে রাক্ষস হয়েছ। এতেও তোমার শিক্ষা হয়নি। এ জন্মেও তুমি পাপ করছ। এর ফলে তুমি মৃত্যুর পর নরকে থাকবে। কষ্ট পাবে। সুতরাং এখন থেকে সৎকর্ম কর, সৎপথে চলে এসো। তাহলে তুমি মুক্তি পাবে।

এভাবে জলরাক্ষসকে সৎ পথে এনে বোধিসত্ত্ব বনে বাস করতে লাগলেন। তারপর একদিন পিতার মৃত্যুর খবর পেয়ে রাজ্যে ফিরে গেলেন। তিনি বারানসির রাজা হলেন। চন্দ্রকুমারকে করলেন উপরাজ। সূর্যকুমারকে দিলেন সেনাপতির পদ। রাক্ষসের জন্য সুন্দর ঘর ও সুখের ব্যবস্থা করলেন। এভাবে রাজধর্ম পালন করে তিনি পরলোক গমন করলেন। পুণ্যবলে মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গ লাভ করলেন।

উপদেশ: ধর্মপথে চললে জয় অনিবার্য।

অনুশীলনমূলক কাজ
রাজা কেন রানিকে বর দিতে চেয়েছিলেন?
বোধিসত্ত্ব রাক্ষসকে সৎপথে আনার জন্য কী বলেছিলেন?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...